মোঃ আবু সাইদ শওকত আলী,
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে, যখন দেশে টেলিফোন, টেলিগ্রাম বা ডাকবাহক ট্রেনের অস্তিত্ব ছিল না — তখনই বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল “রানার” বা “ডাক-রানার”।
“রানার” পেশার সূচনা হয়েছিল ১৭শ শতকের দিকে মোগল আমলে। তবে এটি সংগঠিত রূপে চালু হয় ১৭৬৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর। প্রথমে এই ব্যবস্থা চালু হয়
কলকাতা–ঢাকা–মুর্শিদাবাদ–চট্টগ্রাম রুটে।
ইংরেজরা যখন ভারতে তাদের প্রশাসনিক যোগাযোগ দ্রুত করতে চাইল, তখন তারা ইউরোপীয় ডাক-সিস্টেমের আদলে পায়ে হেঁটে চলা “রানার”দের নিযুক্ত করে। এই পেশাটি তখন থেকেই বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও রাজশাহী অঞ্চলে রানারদের পদচারণা ছিল।
একজন রানার সাধারণত কাঁধে ডাকের থলে, হাতে একটি ঘণ্টা বা বর্শা নিয়ে পায়ে হেঁটে কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করতো।
ঘণ্টার শব্দে মানুষ বুঝতো — “ডাক আসছে!”
প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর “রানার পোস্ট” বা “ডাক বাংলো” থাকতো, যেখানে একজন রানার এসে চিঠি হস্তান্তর করতো পরবর্তী রানারের হাতে। এভাবেই এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খবর পৌঁছে যেত দিনে বা রাতে, বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে।
ঢাকায় নবাব, জমিদার ও সরকারি প্রশাসনে যোগাযোগ রক্ষার একমাত্র মাধ্যম ছিল এই রানাররা। তারা ছিলেন বিশ্বাসের প্রতীক, কারণ তাদের ওপরই নির্ভর করতো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্র, যুদ্ধবাণী বা বাণিজ্যিক বার্তা।
তাদের অনেক জায়গায় বলা হতো ডাক-বাহক, ডাক-পিয়ন, বা রানার-বালক।
গ্রামীণ বাংলায় “রানার এসেছে” — এই ডাক মানেই ছিল এক নতুন খবর, কখনো আনন্দ, কখনো বেদনার সংবাদ।
রেললাইন, টেলিগ্রাফ, তারপর আধুনিক ডাক ও ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে এই পেশাটি আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
তবুও বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো কয়েকজন গ্রামীণ ডাকবাহক সেই পুরোনো ঐতিহ্যের ধারক।
“রানার” ছিল শুধু একটি পেশা নয় — এটি ছিল বিশ্বাস, দায়িত্ব ও দেশের প্রাণস্পন্দনের প্রতীক।
তাদের ঘাম, ক্লান্তি আর দৃঢ় পদক্ষেপের ওপরই দাঁড়িয়েছিল বাংলার যোগাযোগের প্রাচীন ইতিহাস
আজ সেই রানার নেই,
তবুও বাংলার গ্রামীণ পথের ধুলোয় যেন এখনো ভেসে আসে সেই ঘণ্টার ধ্বনি,
যেন কেউ বলছে —
“ডাক আসছে…”
রানার পরিশ্রম, ত্যাগ আর দায়িত্বের অনন্য প্রতীক, বৃষ্টিভেজা কাঁদা-পথ, অন্ধকার রাত,
কোথাও বন্যা, কোথাও পাহাড়ি জনপথ —
তবুও থামতো না সে। বাংলার সেই অবিচল পথিক, রানার।
সম্পাদক ও প্রকাশক:এস এম রেদ্বোয়ান
Copyright © 2026 দৈনিক সময়বেলা. All rights reserved.