অপুদাস,
কালীগন্জ প্রতিনিধি-
অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক মধ্যবয়সী নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একই সময় পাশেই আরেকটি গাছে দুজন পুরুষকেও গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন স্থানীয়রা। কালীগঞ্জ পৌর শহরের আড়পাড়া নদীরপাড় গ্রামে গত ৩১ ডিসেম্বর এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে স্থানীয় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন।
পরে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরে ভুক্তভোগী নারী কালীগঞ্জ থানায় ধর্ষণ, গাছে বেঁধে নির্যাতন ও চুল কেটে দেয়ার অভিযোগে মামলা করেছেন। গতকাল ৫ জানুয়ারি কালীগঞ্জ থানায় বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী। মামলা নম্বর ৩/৫.০১.২০২৬। ওই মামলায় হাসান (৪৫) নামে একজন আটক করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী নারী কালীগঞ্জ থানা হেফাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সরেজিমনে গেলে ভুক্তভোগী নারীর বাড়ির ভাড়াটিয়া সুমি খাতুন জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর গ্রামের এক নারীর বাড়িতে বহিরাগত দুই পুরুষ অবস্থান করছে, এমন অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন ওই বাড়িতে প্রবেশ করে। এসময় ওই বাড়ির মালিক ভুক্তভোগী নারীর ঘর থেকে দুজন তরুণ যুবককে আটক করে স্থানীয়রা। পরে উত্তেজিত স্থানীয়রা ওই নারীর কাছে দুই তরুণের পরিচয় জানতে চায়। ওই নারী দুই তরুণকে তার আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দেন। এসময় স্থানীয় শাহিন ও হাসান সহ অন্যান্যরা আটক দুই তরুণ যুবককে তাদের পরিচয় দিতে বললে তারা একেক সময় একেক রকম কথা বলতে শুরু করে। এ নিয়ে এক পর্যায়ে স্থানীয়রা তাদের মাঝে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বাড়ির বাইরে বের করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
ভুক্তভোগী নারীর প্রতিবেশী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মেহেদী হাসান জুয়েল জানান, বাড়ির সামনে গাছের সঙ্গে ওই নারী সহ দুই তরুণ যুবককে বেঁধে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে উত্তেজিত স্থানীয় মহল্লার লোকজন। এসময় কেউ কেউ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা দুই তরুণকে মারধর করেন। এসময় ওই নারীকে স্থানীয় লোকজন চড়থাপ্পড় দেন।
ভুক্তভোগীর প্রতিবেশী আরেক নারী বলেন, ঘটনা ঘটলো একরকম। ইন্টারনেটে দেখছি আরেক রকম। মেয়েলোকটারে খুব মেরেছে। তবে কোনো পুরুষ মানুষ তাকে মারেনি। দু-একটা চড় থাপ্পড় যা মারার, মহিলারাই মেরেছে। এখন একজনের বাড়িতে কে আসছে আর কে যাচ্ছে, তা আমরা দেখলেও তো বলতে পারি না। বলা ঠিকও না। তবে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
আড়পাড়া নদীরপাড় গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ঘটনার দিন আমি শহরে ছিলাম। থানা থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হলো, আপনার গ্রামে একটা মেয়েলি ঝামেলা হচ্ছে, গিয়ে মীমাংসা করে দেন। আমি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, ওই নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। পরে গ্রামের মুরুব্বিরা এসে ওই নারীকে সতর্ক করে তার বাঁধন খুলে দেয়। আটক অপর দুই তরুণকেও ছেড়ে দেয়। ঘটনা ৩১ তারিখের। পরে শুনছি, ওই নারী এখন গ্রামের চার জনের নামে ধর্ষণের মামলা দিয়েছে। গ্রামের লোকজন মিথ্যা অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার ঘটনায় প্রতিবাদ করার জন্য মানববন্ধন করতে গেলেও পুলিশ আমাদের কর্মসূচি করতে দেয়নি।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ভাই, আমি এখন খুব অসুস্থ। কথা বলতে পারছিনা।’ কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কালীগঞ্জ থানায় আছি। আর কোনো কথা বলতে পারছিনা।’
এদিকে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে ভুক্তভোগী নারী পরদিন ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যান। এরপর আজ ৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তিনি আবারও ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের গাইনী বিভাগে ভর্তি হন। এসময় কালীগঞ্জ থানার নারী পুলিশ সদস্য সহ একাধিক পুলিশ সদস্য ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে ছিলেন। পরে ধর্ষণের নমুনা প্রদান ও শারীরিক পরীক্ষা শেষে ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সহ হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান।
ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কালীগঞ্জের এক নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানি। তিনি গতকালই (৫ জানুয়ারি) হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। এরপরে আর কি হয়েছে, তা জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানাবো।
কালীগঞ্জ থানার ওসি জেল্লাল হোসেন বলেন, ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন। আমরা মামলা রেকর্ড করেছি। মামলার এজাভুক্ত একজন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক:এস এম রেদ্বোয়ান
Copyright © 2026 দৈনিক সময়বেলা. All rights reserved.